Skip to content

মুখস্থ নয় মনে রাখার কিছু পদ্ধতি

অনেকেই হয়তোবা ভেবে থাকেন, মুখস্থ আর মনে রাখা এক জিনিস। কিন্তু না। আসল ব্যাপার হচ্ছে, মুখস্থ করা আর মনে রাখা বা স্মরণ রাখা এক নয়। মুখস্থ যে কেউই করতে পারে। অনেকটা তোতা পাখির মত আওড়িয়ে যাওয়াকেই মুখস্থ করা বলে। একটি তোতাপাখি হুবহু অনুরুপ কিছু বলতে পারলেও এর দ্বারা কি বোঝানো হলো, তা বেশীরভাগ সময়ই বলতে পারে না। কিন্তু মনে রাখা হচ্ছে, কোনও বিষয়ের সারমর্ম বা এর দ্বারা কি বোঝানো হয়েছে, তা অনুধাবন করা ও সেই অনুযায়ী কাজ করতে ব্রতী হওয়া। কোন জিনিষ মনে রাখার বা স্মরণ রাখার বেশ কিছু উপায় নিন্মে বর্ণিত হলো। আশা করি যারা কোনও বিষয় মনে রাখতে চান, তাদের কাজে লাগবেঃ

১। না বুঝে মুখস্থ থেকে বিরত থাকুনঃ কাজের সময় কোনও জিনিষ মনে না পড়লে, সেই কাজ করা সম্ভব হয়ে উঠে না। অনেকেই নতুন কোনও ভাষার বিষয়বস্তু অর্থ না বুঝেই মুখস্থ করতে চান, কিন্তু এ ক্ষেত্রে তার মুখস্থ করার ক্ষমতা কম থাকার কারনে প্রায়ই ভুলে যান। এ ক্ষেত্রে সহজ সমাধান হচ্ছে অর্থ দেখে বুঝে বুঝে বার বার পড়ুন। এটা দিয়ে কী বুঝাচ্ছে সে বিষয়টি মনে রাখুন। দেখবেন, খুব সহজেই মুখস্থ হয়ে গেছে।

২। অসময়ে ঘুমানোঃ সকালে ফজরের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত ও বিকালে সূর্য অস্ত যাওয়ার সময় কখনই ঘুমাবেন না। কারণ, এই দুই সময়ে ঘুমানোর কারনে স্মরণশক্তি আশ্চর্যজনকভাবে কমে যায়। হাদীসে এই দুই সময়ে ঘুমানোর ব্যাপারে নিষেধ করা হয়েছে।

৩। বুঝে, শুনে মুখস্থ করাঃ কোন জিনিষ না বুঝে মুখস্থ করবেন না। এর ফলে মস্তিষ্ক অস্থির হয়ে যায়। এবং মনে রাখা জিনিষও ভুলে যাওয়ার কারণ হয়। বরং জেনে, বুঝে কোন জিনিষ আত্মস্থ করে নিন। কেবল, কুরআনের বেলায় এই নিয়ম খাটবে না। কারণ, কুরআন সংরক্ষন বা হিফজ করা স্মৃতিশক্তির সাথে সম্পর্কিত নয়। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং নিজেই সাহায্য করে থাকেন।

৪। স্মরণশক্তি বাড়ানোর জন্য দু’আ ও যিকির করাঃ আল্লাহর সাহায্য ছাড়া আসলে কোনও কিছু মনে রাখা সম্ভব হয়ে উঠে না। তাই বেশী বেশী জিকির করা ও আল্লাহর কাছে এ ব্যপারে সাহায্য চাওয়া, যেন তিনি আমাদের মুখস্থ করার ক্ষমতা বা স্মরণশক্তি বাড়িয়ে দেন। স্মরণশক্তি বাড়ানোর জন্য এই দু’আ বেশী বেশী করে পড়ুন।

اًرَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِنْ لِسَانِي يَفْقَهُوا قَوْلِي
ربِّ زِدْنِي عِلْم

উাচ্চারনঃ রাব্বিশ রাহলী সাদরি; ওয়া ইয়াসসিরলি আমরি; ওয়াহলুল উ’কুদাতাম মিল্লিসানি; ইয়াফকাহু ক্বওলী; রাব্বি ঝিদনী ঈলমা।

অর্থাৎঃ হে আমার পালনকর্তা! আমার হৃদয় খুলে দিন (আমাকে আত্মবিশ্বাস, সন্তুষ্টি এবং সাহস প্রদান করুন); আমার জন্য আমার কাজ সহজ করুন; এবং আমার বক্তব্যের বাধা অপসারণ করে দিন, যাতে তাঁরা আমার কথা বুঝতে পারে। হে আমার পালনকর্তা, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন। (সুরাহ ত্ব-হা; ২০ঃ ২৫-২৮)

رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ

উচ্চারনঃ রাব্বী ইন্নি বিমা আংঝালতা ইলাইয়া মিন খাইরিন ফাকীর।
অর্থাৎঃ হে আমার পালনকর্তা! আপনার প্রেরিত প্রত্যেকটি ভালো জিনিষের প্রতি আমি অত্যন্ত মুখাপেক্ষী। (সূরা কাসাস; ২৮ঃ২৪)

اَللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا , وَ رِزْقًا طَيَّبًا , وَ عَمَلاً مُتَقَبَّلاً

উচ্চারনঃ আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা ইলমান না’ফিয়া্ন; ওয়া রিযকান তাইয়্যেবান; ওয়া আমালাম মুতাকাব্বালান।

অর্থাৎঃ হে আল্লাহ! আমাকে উপকারী ইলম (জ্ঞান) দান করুন , পবিত্র রিজিক দান করুন এবং আপনার কাছে গ্রহণীয় আমলের তৌফিক দান করুন। (ইবনে মাযাহ এবং অন্যান্য)

اللِّهُم انّفَعنِي بِمَا عَلَّمتَنِي وَ عَلِّمنِيِ مَا يَنفَعنِي

উচ্চারনঃ আল্লাহুম্মা ইংফা’আনী বিমা ‘আল্লামতানি ওয়া আল্লামনি মা ইয়াংফা’উনী।
অর্থাৎঃ হে আল্লাহ! আপনি আমাকে যা শিখিয়েছেন  তা আমার জন্য উপকারী বানিয়ে দিন এবং আমাকে এমন জ্ঞান শিক্ষা দিন যা আমার উপকার করে।

اللَّهُمَّ الْطُفْ بِىْ فِىْ تَيْسِيْرِ كُلِّ عَسِيْرٍ فَاِنَّ تَيْسِيْرَكُلِّ عَسِيْرٍ عَلَيْكَ يَسِيْرٌَ

উচ্চারনঃ আল্লাহুম্মা আলতুফ বী ফী তাইসিরি কুল্লি ‘আসীর, ফাঈন্না তাইসীরা কুল্লী আসীরীন আলাইকা ইয়াসির।

অর্থাৎঃ হে আল্লাহ! আপনার বিশেষ অনুগ্রহ ও মেহেরবানী দিয়ে আমার জন্য প্রত্যেক কঠিন বিষয় সহজ করে দিন, কারন আপনার জন্য যেকোন কঠিন বিষয় সহজ করা খুবই সহজ।

৫। ইখলাস বা আন্তরিকতাঃ যেকোনো কাজ নিখুঁতভাবে করতে হলে সবার প্রথমে যেই জিনিষটা দরকার হয় তা হচ্ছে আন্তরিকতা। কোন জিনিষ নির্ভুলভাবে মুখস্থ বা আত্মস্থ করতে হলে এটা খুব জরুরী। আর ইখলাস বা আন্তরিকতার মুল ভিত্তি হচ্ছে বিশুদ্ধ নিয়্যাত বা উদ্দেশ্য। নিজেকে নিজে প্রশ্ন করুন, কেন আপনি এটা মুখস্থ করছেন। আপনার মন যেই উত্তরটা দিবে, তাতে কি আপনি সন্তুষ্ট? যদি সন্তুষ্ট থাকেন, তাহলে ভালো। আর যদি না থাকেন, তাহলে আজই নিয়্যাতকে বিশুদ্ধ করে নিন। সবকাজ আল্লাহর জন্য বা আল্লাহকে রাজী-খুশি করার জন্য করলে দেখবেন তা এম্নিতেই সুন্দর ভাবে আত্মস্থ হয়ে গেছে।

৬। অন্যায় কাজ থেকে দূরে থাকাঃ প্রতিটি অন্যায় কাজ বা পাপ কাজই হচ্ছে এক একটি জুলমত বা অন্ধকার। পাপের অন্ধকার আর জ্ঞানের আলো কখনও একত্রে থাকতে পারে। প্রতিনিয়ত পাপ কাজে ডুবে থাকার একটি প্রতিক্রিয়া হচ্ছে দুর্বল স্মৃতিশক্তি।

ইমাম শাফেয়ী (র) নিজের শাইখ ওয়াকীকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তর দেন, আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান হচ্ছে একটি আলো যা কোনও পাপাচারীকে দেয়া হয় না।

যখন মানুষ কোনও অন্যায় কাজ করে তখন এটা তাঁর উদ্বেগ ও দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সে তাঁর কৃতকর্মের কারণে সর্বদা পেরেশান ও ব্যতিব্যস্ত থাকে। এ কারণে তাঁর অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যায় এবং জ্ঞান অর্জনের মত কল্যাণকর বস্তু তাঁর কাছে ভালো লাগে না। তাই আমাদের উচিৎ সর্ব অবস্থায় পাপ কাজ ও খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকতে সর্বাত্মক চেষ্টা করা।

৭। পঠিত বিষয় অনুযায়ী কাজ করাঃ আমরা সকলেই জানি যে, একটি বিষয় বার বার বলা হলে বা পড়া হলে তা খুব তাড়াতাড়ি মস্তিষ্কে বসে যায়। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে সারাক্ষন বসে বসে পড়া হয়তোবা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। তবে এসব বিষয় অনুযায়ী কাজ করতে চেষ্টা করলেই দেখবেন, খুব দ্রুত তা আত্মস্থ হয়ে গেছে। কোনও সুরার আয়াত বা দু’আ মনে রাখতে চাইলে সালাত কিংবা অন্য সময় তা তিলাওয়াত করুন। দেখবেন, খুব সহজেই তা অন্তরে বসে গেছে।.
৮। অবস্থান পরিবর্তন করে চেষ্টা করাঃ একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, একেকজনের পড়া মুখস্থ করার ধরণ একেক রকম হয়ে থাকে। কারো হয়তোবা শুয়ে পড়লে মনে থাকে, কারো হেঁটে হেঁটে পড়লে মনে থাকে। কেউবা নিরবে পড়তে ভালবাসে। আবার কেউ আওয়াজ করে পড়ে থাকে। অনেকের আবার শুনতে শুনতে মুখস্থ হয়ে যায়। সময়ের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম দেখা যায়। কারো কারো পড়া ভোরে মুখস্থ হয়, কারোবা রাতের গভীরে নির্জনতায় পড়লে ভালো মনে থাকে। তাই প্রত্যেকেরই নিজ নিজ পছন্দমত সময় ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা অনুযায়ী পড়ার সময় ঠিক করে নিতে হবে।
আর কুর’আন মুখস্থ করার সময় একটি নির্দিষ্ট মুসহাফ (কুর’আনের আরবি কপি) ব্যবহার করতে হবে। কারণ বিভিন্ন ধরনের মুসহাফে পৃষ্ঠা ও আয়াতের বিন্যাস বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। একটি নির্দিষ্ট মুসহাফ নিয়মিত ব্যবহারের ফলে মস্তিষ্কের মধ্যে তার একটি ছাপ পড়ে যায় এবং মুখস্থকৃত অংশটি অন্তরে গভীরভাবে গেঁথে যায়।
৯। অন্যকে শেখানোঃ কোনো কিছু শেখার একটি উত্তম উপায় হলো তা অন্যকে শেখানো। আর এজন্য আমাদেরকে একই বিষয় বারবার ও বিভিন্ন উৎস থেকে পড়তে হয়। এতে করে ঐ বিষয়টি আমাদের স্মৃতিতে স্থায়ীভাবে গেঁথে যায়।
১০। মস্তিষ্কের জন্য উপকারী খাদ্য গ্রহণঃ পরিমিত ও সুষম খাদ্য গ্রহণ আমাদের মস্তিষ্কের সুস্বাস্থ্যের জন্য একান্ত আবশ্যক। অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ আমাদের ঘুম বাড়িয়ে দেয়, যা আমাদের অলস করে তোলে। ফলে আমরা জ্ঞানার্জন থেকে বিমুখ হয়ে পড়ি। তাছাড়া কিছু কিছু খাবার আছে যেগুলো আমাদের মস্তিষ্কের জন্য খুবই উপকারী। সম্প্রতি ফ্রান্সের এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে যয়তুনের তেল চাক্ষুস স্মৃতি (visual memory) ও বাচনিক সাবলীলতা (verbal fluency) বৃদ্ধি করে। আর যেসব খাদ্যে অধিক পরিমাণে Omega-3 ফ্যাট রয়েছে সেসব খাদ্য স্মৃতিশক্তি ও মস্তিষ্কের কার্যকলাপের জন্য খুবই উপকারী। স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির জন্য অনেক ‘আলিম কিছু নির্দিষ্ট খাদ্য গ্রহণের কথা বলেছেন। ইমাম আয-যুহরি বলেন, “তোমাদের মধু পান করা উচিত কারণ এটি স্মৃতির জন্য উপকারী।”
মধুতে রয়েছে মুক্ত চিনিকোষ যা আমাদের মস্তিষ্কের গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া মধু পান করার সাত মিনিটের মধ্যেই রক্তে মিশে গিয়ে কাজ শুরু করে দেয়। ইমাম আয-যুহরি আরো বলেন, “যে ব্যক্তি হাদীস মুখস্থ করতে চায় তার উচিত কিসমিস খাওয়া।”
১১। পরিমিত পরিমাণে বিশ্রাম নেয়াঃ আমরা যখন ঘুমাই তখন আমাদের মস্তিষ্ক অনেকটা ব্যস্ত অফিসের মতো কাজ করে। এটি তখন সারাদিনের সংগৃহীত তথ্যসমূহ প্রক্রিয়াজাত করে। তাছাড়া ঘুম মস্তিষ্ক কোষের পুণর্গঠন ও ক্লান্তি দূর করার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে দুপুরে সামান্য ভাতঘুম আমাদের মন-মেজাজ ও অনুভূতিকে চাঙা রাখে। এটি একটি সুন্নাহও বটে। আর অতিরিক্ত ঘুমের কুফল সম্পর্কে তো আগেই বলা হয়েছে। তাই আমাদের উচিত রাত জেগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাওয়াহ বিতরণ না করে নিজের মস্তিষ্ককে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়া।
১২। জীবনের অপ্রয়োজনীয় ব্যাপারসমূহ ত্যাগ করাঃ বর্তমানে আমাদের মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া ও জ্ঞান অর্জনে অনীহার একটি অন্যতম কারণ হলো আমরা নিজেদেরকে বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় কাজে জড়িয়ে রাখি। ফলে কোনো কাজই আমরা গভীর মনোযোগের সাথে করতে পারি না। মাঝে মাঝে আমাদের কারো কারো অবস্থা তো এমন হয় যে, সালাতের কিছু অংশ আদায় করার পর মনে করতে পারি না ঠিক কতোটুকু সালাত আমরা আদায় করেছি। আর এমনটি হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে নিজেদেরকে আড্ডাবাজি, গান-বাজনা শোনা, মুভি দেখা, ফেইসবুকিং ইত্যাদি নানা অপ্রয়োজনীয় কাজে জড়িয়ে রাখা। তাই আমাদের উচিত এগুলো থেকে যতোটা সম্ভব দূরে থাকা।
১৩। হাল না ছাড়াঃ যে কোনো কাজে সফলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো হাল না ছাড়া। যে কোনো কিছু মুখস্থ করার ক্ষেত্রে শুরুটা কিছুটা কষ্টসাধ্য হয়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আমাদের মস্তিষ্ক সবকিছুর সাথে মানিয়ে নেয়। তাই আমাদের উচিত শুরুতেই ব্যর্থ হয়ে হাল না ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: