Skip to content

কিভাবে তৈরি করবেন ক্যাস্টিল বা জলপাই তেলের তৈরি সাবান

আজকে আমি আপনাদের সাথে শেয়ার করবো খুব সাধারণ কিছু উপাদান দিয়ে তৈরি করা একটি অসাধারণ সাবানের রেসিপি। একই সাথে এই সাবানটি কি করলে কিছুটা শক্ত হয়ে উঠবে, তাও বলবো।

বেশিরভাগ রেসিপিতে চার অথবা এর চেয়ে বেশি তেল এবং নানা ধরনের আনুষঙ্গিক জিনিস ও এসেনশিয়াল অয়েল ব্যবহার করতে বলা হয় যা বেশ ব্যয় সাপেক্ষ। তবে এই রেসিপিতে মাত্র তিনটি উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে যা সচরাচর পাওয়া যায় এবং ১০০% খাঁটি ও প্রাকৃতিক হাতে তৈরি সাবান।

আর এই রেসিপিটি হচ্ছে একটি ঐতিহ্যবাহী সাবানের রেসিপি যা অলিভ ওয়েল সাবান বা ক্যাসটিল সাবান বলে পরিচিত এবং খুব সহজেই বানানো যায়।

আপনি যদি কোল্ডপ্রসেস প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সাবান তৈরি করে থাকেন তবে আমি আপনাকে এমন একটি পদ্ধতি বলে দেবো যা অনুসরণ করে সাবান তৈরি করার পর তা আপনার ত্বকের সাথে খুব ভালোভাবে মানিয়ে যাবে।

ঘরে বানানো ক্যাসটিল সাবান

এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল দিয়ে তৈরি ক্যাসটিল সাবান সাধারণত খুব মৃদু ক্ষার যুক্ত হয়, এবং হালকা হলুদ রঙের হয়।

সাবান তৈরি করার জন্য তেল

সাধারণত কোল্ড প্রসেস সাবান তৈরি করার জন্য যেকোনো তেল ব্যবহার করা যায়। একেক ধরনের সাবানের একেক রকম বৈশিষ্ট্য আছে। নারকেল তেলের তৈরি সাবান শক্ত ও ফেনাযুক্ত হয়, সানফ্লাওয়ারের তৈরি সাবান কিছুটা নরম ও কন্ডিশনিং বার তৈরি করে, ক্যাস্টর তেলের সাবান কিছুটা আঠালো ফেনাযুক্ত সাবান তৈরি করে। কিছু কিছু তেলের মিশ্রণে বেশ ভালো ও সুন্দর সাবান তৈরি হয়। তাই অনেক রেসিপিতে বিভিন্ন তেলের মিশ্রণের কথা বলা হয়েছে। অতিরিক্ত নারকেল তেলের ব্যবহার হলে আপনার সাবান সহজে শুকিয়ে যাবে, অতিরিক্ত ক্যাস্টর তেলের ব্যবহার করা হলে সাবান আঠালো হয়ে যাবে।

এর মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম হচ্ছে চর্বিজাত সাবান ও পিউর অলিভ তেলের তৈরি সাবান। অলিভ অয়েল সাবানের ক্ষেত্রে আপনি এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল অথবা পমেস অলিভ অয়েল ব্যবহার করে খুব সুন্দর সাবান বানাতে পারেন। প্রথমটি কিছুটা ব্যয়বহুল কিন্তু উচ্চ মানসম্পন্ন প্রাকৃতিক সাবান। খাঁটি অলিভ অয়েল সাবানের ফেনা কিছুটা ক্রিমের মত হয় কিন্তু খুবই সফট ও সেনসিটিভ হয়।

ক্যাস্টিল সাবান কেমন হয়

স্বাভাবিকভাবে, অলিভ অয়েল দিয়ে বেশ ভালো শক্ত সাবান তৈরি করা সম্ভব যা বেশ সংবেদনশীল ত্বকের জন্য উপকারী, পুষ্টিকর ও আপনার চামড়াকে শুষ্ক করবে না। এর ফেনা কিছুটা অন্যরকম হয়, অনেকটা ক্রিমের মত কিন্তু কেউ কেউ আঠালো বলেও দাবী করে থাকে। এতে নারকেল তেল বা ক্যাস্টর তেলের মত বড় বড় ফেনাযুক্ত বুদবুদ না হলেও এটি ব্যবহার করতে বেশ ভালো লাগবে। অন্য কোনও সাবান করে এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ ওয়েলের মত ভালো মনে হবে না।

এই সাবান তৈরির প্রক্রিয়া কবে আবিস্কার হয়েছে তা পরিষ্কার নয়। কিন্তু এটা একসময় অলিভ অয়েল ও লরেল অয়েলের মিশ্রণে তৈরি হতো। যা আলেপ্পো সাবান নামে পরিচিত ছিলো। ক্রুসেড পরবর্তী সময়ে ইউরোপে এই সাবান আবিষ্কার হয়েছিলো। লরেল তেল সহজে পাওয়া যেতো না। তাই স্পেনের ক্যাস্টিল এলাকার মানুষেরা এই তেলটি ছাড়াই শুধুমাত্র অলিভ অয়েল দিয়ে সাবান বানাতে শুরু করে। এভাবেই খাঁটি অলিভ অয়েল সাবানের উদ্ভাবন হয়।

কিভাবে বানাবেন অলিভ অয়েল সাবান

আগেই বলেছি, অলিভ অয়েলের সাবান তৈরি করা সাবান প্রস্তুতকারকদের জন্য কিছুটা কষ্টসাধ্য কাজ। কারণ এতে ট্রেস তৈরি হতে অনেক্ষন সময় লাগে, মোল্ডে শক্ত হতেও প্রচুর সময় নেয়, এবং কিউর করতেও অনেক সময় নেয়। আপনি যদি এজন্য নিজেকে প্রস্তুত করে নেন, তাহলে এটা তৈরি করা বেশ সহজ।

আমি এই রেসিপিতে বেশ কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করেছি, যার ফলে আপনার সময় আরও কম লাগবে। আমরা এখানে অন্যান্য সাবান তৈরির প্রক্রিয়া থেকে কম পানি ব্যবহার করেছি এবং একটি অতিরিক্ত উপাদান সোডিয়াম ল্যাক্টেট ব্যবহার করেছি, যা এই সাবানটিকে শক্ত করতে সাহায্য করবে। স্বাভাবিক খাবারের লবন দিয়েও এটা করা যায় কিন্তু সোডিয়াম ল্যাক্টেট আরও বেশী নির্ভরযোগ্য।

ক্যাস্টিল সাবানের মোল্ড তৈরি হতে ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগে এবং সোডিয়াম ল্যাকটেট ব্যবহার না করা হলে চার দিনের বেশী সময় লাগতে পারে।

সাধারণ ক্যাস্টিল সাবান রেসিপি

এই মোল্ড ব্যবহার করলে আপনি ১ পাউন্ড অথবা ৪৫৪ গ্রাম সাবানের মিশ্রন থেকে ৬ টি সাবানের বার পাবেন। এছাড়াও লাই একটি সাংঘাতিক তেজসস্ক্রিয় পদার্থ। তাই এটা নিয়ে কাজ করার আগে আপনাকে বেশ কিছু সেফটি উপকরণ পড়তে হবে। এই সাবানে ৫% সুপারফ্যাট আছে।

অভিজ্ঞ সাবান প্রস্তুতকারকদের জন্যঃ আপনি চাইলে এই সাবান রুমের তাপমাত্রায় তৈরি করতে পারবেন। রুমের তাপমাত্রায় সাবান তৈরি করলে আপনি অনেকটা প্রাকৃতিক রং পাবেন। কিন্তু এর ফলে সাবানের ট্রেস করার সময় আরও বেড়ে যাবে। আপনি যদি নতুন হয়ে থাকেন তাহলে কিছুটা গরম তাপমাত্রায় তৈরি করতে পারেন। তবে বাংলাদেশ বা ভারতের মত গরম এলাকায় স্বাভাবিক তাপমাত্রাই যথেষ্ট।

লাইয়ের পানি

  • ৫৮ গ্রাম (2.05 oz) সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড (যাকে লাইন, কোস্টিক সোডা, বা NaOH বলা হয়)
  • পানি (পরিশোধিত পানি ব্যবহার করতে হবে)
  • হিট প্রুফ জগ
  • ১ চামচ ফাইন লবন বা সোডিয়াম ল্যাক্টেট

লিকুইড তেল

৪৫৪ গ্রাম (১৬ আউন্স) এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল

ট্রেস হওয়ার পর সুগন্ধ হিসেবে যা যোগ করবেন

১৪ গ্রাম এসেনশিয়াল তেল অথবা ল্যাভেণ্ডার এসেনশিয়াল তেল।

শক্তিশালী ও মজবুত হ্যান্ড ব্লেন্ডার দরকার হবে।

ক্যাস্টিল সাবান তৈরি করতে আপনার শক্তিশালী ও মজবুত হ্যান্ড ব্লেন্ডার দরকার হবে, কারণ এর ‘ট্রেস’ তৈরি হতে বেশ লম্বা সময় লাগে।

প্রটেক্টিভ টুলস

লাইয়ের পানি তৈরি ও মেশানোর পূর্বে অবশ্যই আপনার চামড়া ও চোখকে বাঁচানোর জন্য প্রটেক্টিভ গগলস, গ্লাভস এবং পার্সোনাল প্রটেক্টিভ স্যুট পরে নিবেন। তাহলে তেজস্ক্রিয় উপাদান ছিটকে এসে লাগলেও আপনার কোনও ক্ষতি হবে না।

নতুনদের জন্য প্রাকৃতিক সাবান তৈরির রেসিপি

হাতে তৈরি প্রাকৃতিক সাবানের ক্ষেত্রে আপনি যদি একেবারে নতুন হয়ে থাকেন, তাহলে আপনি এই ব্লগটি পড়ে দেখতে পারেনঃ Four-part series on natural soap making. এখানে, আপনি খুব সহজেই সাবানের বিভিন্ন উপাদান, সরঞ্জাম, কোল্ড প্রসেস সোপ রেসিপি এবং সাবান তৈরির বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পারবেন।

ধাপ ১- লাইয়ের দ্রবন তৈরি করা 

লাইয়ের দ্রবন তৈরির জন্য কম পানি মেশানো হলে ক্যাস্টিল সোপ রেসিপির জন্য তিনটি বিষয়ে সহায়ক হবে। এর ফলে সোডা অ্যাশ তৈরি হবে না, সাবানের ট্রেস দ্রুত তৈরি হবে। এবং এর ফলে কিউরিং করার সময় কমে আসবে। সাবানে পানির পরিমাণ কম হলে কিউরিং এর সময় উবে যাওয়া পানির পরিমাণও কম হবে, ফলে কিউরিং এর সময়সীমা কমে যাবে।

লাইয়ের দ্রবন বেশ শক্তিশালী তেজস্ক্রিয় পদার্থ। যদি এটা কোনক্রমে আপনার চামড়ায় লাগে, তাহলে সাথে সাথে পুড়ে যাবে। এবং এর থেকে বের হওয়া ধোঁয়া আপনার মোটেই ভালো লাগবে না। তাই লাইয়ের দ্রবণ বানাবার সময় বেশ খোলামেলা ও আলো বাতাস চলাচল করতে পারে, এমন জায়গা বেছে নেয়াই ভালো। সবচেয়ে ভালো হয় বাহিরে উঠান বা ছাদের মতো কোনও জায়গা হলে। আপনি সোডিয়াম ল্যাক্টেট অথবা লবন লাইয়ের ক্রিস্টালের সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করতে পারেন।

গগলস এবং গ্লাভস পরে নিয়ে লাইয়ের ক্রিস্টাল ও লবন পানিতে মিশিয়ে নাড়তে থাকুন। নেড়ে মেশানোর সময়ে যে তাপ বের হয়, তা যেনো আপনার মুখে না লাগে। মেশানোর সময় পানিটা অনেক গরম হয়ে যাবে।

লাই সম্পূর্ণ মিশে যাওয়া পর্যন্ত নাড়তে থাকুন, এরপর জগটি পানি ভর্তি কোনও গামলা বা বেসিনে রাখুন, যাতে ঠাণ্ডা হয়ে যায়। এবার এটাকে ১০০° ফা/ ৩৮° সে তাপমাত্রায় ঠাণ্ডা করে নিন।

ধাপ ২: অলিভ অয়েল তেল কিছুটা গরম করুন

একটি স্টেইনলেস স্টিল সসপ্যানে অলিভ অয়েল ঢেলে নিন এবং এটাকে ১০০° ফা/ ৩৮° সে তাপমাত্রায় গরম করে নিন। যখন লাইয়ের পানি আর তেল মোটামুটি একটি অপরটি থেকে ১০ ডিগ্রী সেলসিয়াস কম বেশী থাকবে, তখনই মেশানোর জন্য উপযুক্ত সময়। আপনার প্যানটি তাপ থেকে সরিয়ে খোলামেলা জায়গায় রাখুন এবং পরের ধাপে যান।

ধাপ ৩: স্টিক ব্লেণ্ডার দিয়ে ব্লেণ্ড করুন

একটি পরিষ্কার ছাঁকনি দিয়ে লাইয়ের পানি ছেঁকে নিয়ে আস্তে আস্তে অলিভ অয়েল তেলে ঢালুন। এটাকে নেড়েচেড়ে একত্রে মেশান এবং ‘ট্রেস’ তৈরি করুন। ট্রেস হওয়া মানে হচ্ছে যখন সাবানটি একেবারে কাস্টার্ড বা পুডিংয়ের মত গাড় হয়ে যাবে, সেই সময়টা। ধীরে ধীরে স্টিক ব্লেন্ডার দিয়ে নেড়েচেড়ে ব্লেণ্ড করতে হবে।

ধাপ ৪: ট্রেস তৈরি হওয়া

যখন আপনি উপর থেকে কিছু সাবান নিয়ে সাবানের উপর ঢাললে একটি দাগ তৈরি হবে, মিশে যাবে না, তখন বুঝবেন সাবানের ট্রেস তৈরি হয়েছে। আমি খুব হালকা ট্রেস তৈরি হলেই ব্লেন্ড করা থামিয়ে দেই, কারণ এতে করে মোল্ডের ভিতর খুব সুন্দরভাবে সেট হয়ে যায়। অনেক বেশী ভারী করে ট্রেস করা হলে তা সাধারণত মোল্ডের উপর অনেকটা অসমতল হয়ে থাকে, এবং সহজে সমান হতে চায় না। তবে নতুনরা হালকা এবং ভারী এ দুটোর মাঝামাঝি রাখতে পারেন।

সাবান যখন ট্রেসে এসে যাবে, তখন এর সাথে এসেনশিয়াল তেল মেশান এবং মোল্ডে ঢালুন। না ঢেকে রুমের তাপমাত্রায় রেখে দিন অথবা চাইলে সারা রাত ফ্রিজেও রেখে দিতে পারেন। এই অবস্থায় মোল্ডটিকে সর্বনিন্ম ৪৮ ঘণ্টা থেকে সর্বোচ্চ চার দিন পর্যন্ত রেখে দিন। হাতে তৈরি ক্যাস্টিল সোপ জমে যেতে কিছুটা সময় লাগে।  

ধাপ ৫: আনমোল্ড করা ও কিউর করা

যখন সাবানটি খুব ভালোভাবে শক্ত হয়ে জমে যাবে, তখন এটাকে মোল্ড থেকে ছাড়িয়ে নিন এবং কিউর করুন। যেহেতু, আপনি ট্রেস করার সময় কম পানি মিশিয়েছেন তাই এটা কিউর হতে ৪ সপ্তাহ লাগবে। পানির পরিমাণ বেশি হলে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। অল্প কথায়,  কিউরিং হচ্ছে ঠান্ডা এবং শুকনো জায়গায় চার সপ্তাহ পর্যন্ত রেখে দেয়া। তবে সাবান কিউরিং করার পদ্ধতি নিয়ে আরেকদিন লিখবো।

ক্যাস্টিল সোপ থেকে মনমতো সাবান তৈরি করা

স্বাভাবিক তিন উপাদানের তৈরি ক্যাস্টিল সোপ হালকা হলুদ রঙের হয়। এর সঙ্গে আপনি চাইলে বিভিন্ন এসেনশিয়াল তেল অথবা প্রাকৃতিক রং মিশিয়ে সাবানে সৌন্দর্য ও সুগন্ধ তৈরি করতে পারেন। ল্যাভেন্ডার, রোজমেরি অথবা অন্যান্য এসেনশিয়াল তেল ব্যবহার করলে এর মধ্যে ফুলের সুঘ্রাণ তৈরি হবে এবং সোডিয়াম ল্যাক্টেট বা লবন মেশালে সাবানের বার সহজে শক্ত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: